তৎকালীন সিলেট বর্তমান সুনামগঞ্জ জেলার অন্তর্গত ছাতক উপজেলার পৌর
শহরের তাতিকোনা গ্রামে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে হাবিব উল্লাহ
তালুকদার একজন উল্লেখযোগ্য ব্যক্তি হিসেবে খ্যাত ছিলেন। তিনি ১৮৬৫ সালে
একটি সম্ভ্রান্ত ও সম্মানিত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি এমন এক
সময়ে জন্মগ্রহণ করেন যখন অত্র অঞ্চলে সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক
অবস্থা বড় ধরনের পরিবর্তনের মধ্য দিয়া অগ্রসর হচ্ছিল। এত চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও
তিনি একজন জ্ঞানী, সৎ ও নৈতিক সততার অধিকারী হিসেবে আবির্ভূত হন।
একজন প্রজা হৈতিষী এবং সালিশ ব্যক্তিত্ব হিসেবে বৃহত্তর ছাতক থানায় তার খ্যাতি
ছড়িয়ে পড়েছিল। কথিত রয়েছে তিনি ঘোড়া চড়ে থানার এক প্রান্ত থেকে অন্য
প্রান্তে সালিশ বিচারে অংশগ্রহণ করতেন। হাবিব উল্লাহ তালুকদারের পিতা হাজী
মোহাম্মদ কামিল তালুকদার পবিত্র হজ পালনে মক্কা শরীফে অবস্থানকালে ইন্তেকাল
করার সময় হাবিব উল্লাহ তালুকদারের বয়স ১২ বৎসর ছিল। পিতার রেখে
যাওয়া ভূসম্পত্তি ও চুনা পাথর পোড়ানোর বড় ব্যবসা রক্ষা করা সেই সময়ের
বাস্তবতায় অনেকটা চ্যালেঞ্জ ছিল কেননা একই গ্রামে ৬/৭ জন অত্র অঞ্চলের বড়
বড় হিন্দু জমিদারের মধ্যখানে একজন মুসলিম জমিদার টিকে থাকাই ছিল
বিস্ময়কর একই সাথে পরবর্তীতে সরপঞ্চের দায়িত্ব পালন করা আরও দুরূহ ছিল।
জনশ্রুতি রয়েছে তার বড় ধরনের ব্যবসা থাকায় বেশিরভাগ প্রজাসাধারণ বিনা
পয়সায় কবুলিয়ত নিতেন বলে তাদের জবানিতে পাওয়া যায়। হাবিব উল্লাহ
তালুকদারের ৪ জন ছেলে ও ৩ মেয়ে ছিলেন। তাদের প্রত্যেকেই ধর্মীয় শিক্ষায়
শিক্ষিত ছিলেন। অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও তিনি তার ২ জন ছেলে
হাজী মুহাম্মদ তোতা মিয়া তালুকদার ও নজিব আলী তালুকদারকে সিলেট শহরের
হযরত শাহজালাল (রঃ) খাদেম (মোতায়াল্লী)সর্বজন শ্রদ্ধেয় মুফতি বাড়িতে লজিং রেখে সিলেট
আলিয়া মাদ্রাসায় পড়াশুনা করান। তার পরবর্তী অধঃস্থন উত্তরাধিকারী অনেকেই
আলোকিত মানুষ হিসেবে পরিচিত রয়েছেন। তিনি জীবিত থাকাকালীন সময়ে বহু
ভূসম্পত্তি মসজিদ ও মাদ্রাসা দান করে গিয়েছেন। পরবর্তীতে তার উত্তরাধিকারীগণ
২০০২ সালে এলাকায় প্রতিষ্ঠিত করেন তার নামানুসারে হাবিব উল্লাহ জামিয়া
মাদ্রাসা তাতিকোনা, ছাতক । উক্ত মাদ্রাসা উদ্বোধন করেন জাতীয় মসজিদ
বায়তুল মোকাররম ঢাকা এর খতিব মাওলানা ওবায়দুল হক, উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে
অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ছাতক থানার তৎকালীন নির্বাহী কর্মকর্তা জনাব
মনিরুজ্জামান, ছাতক পৌরসভার প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান আব্দুল ওয়াহিদ মজনু,
অধ্যক্ষ মাওলানা আনোয়ার শাহ কাশ্মিরী, আলহাজ্ব আবরু মিয়া তালুকদার,
আলহাজ্ব আতাউর রহমান তালুকদার, আলহাজ্ব আব্দুর রহিম, ছোরাব আলী
মেম্বার, আলহাজ্ব সৈয়দ তীতুমীরসহ তাতিকোনা, বৌলা, মোগলপাড়া, চরেরবন্দ,
মন্ডলীভোগসহ অত্র এলাকার নেতৃস্থানীয় মুরব্বীয়ান এবং সর্বস্থরের জন সাধারণ।
বর্তমানে তার নামে অত্র মাদ্রাসার পাশে আরেকটি ইবতেদায়ী মাদ্রাসা চালুর উদ্যোগ
প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। উক্ত মাদ্রাসায় অত্র এলাকা ও চারিপাশের দূর দুরান্তের গ্রাম
থেকে ছাত্ররা এসে দ্বীনি শিক্ষা লাভ করার সুযোগ পাচ্ছে। হাবিব উল্লাহ
তালুকদারের প্রথম পুত্র হাজী তোতা মিয়া তালুকদার পরবর্তীতে অত্র অঞ্চলের
সরপঞ্চ ছিলেন। তার নাতি আলহাজ্ব মুহাম্মদ আতাউর রহমান তালুকদার তরুন
বয়সে বাংলাদেশের ১ম ইউপি নির্বাচনে ১৯৭৩ সালে ছাতক ইউনিয়ন পরিষদের
ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। শিক্ষা দীক্ষায় বিশেষ অবদান রাখার জন্য
২০১৫ সালে আলহাজ্ব মুহাম্মদ আতাউর রহমান এর স্ত্রী সামসুন নাহার সিলেট
শহরের শিক্ষা কল্যাণ ট্রাস্ট এন জে এল সেন্টার নামক প্রতিষ্ঠান থেকে গর্বিত-
মাতার পদক পেয়েছিলেন। ২০১৪ সালে ছাতক উপজেলা চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী
হিসাবে তাঁর নাতি এডভোকেট রেজাউল করিম তালুকদার সর্ব্বোচ্চ পরিমাণ ভোট
পেয়েও তাকে দ্বিতীয় অবস্থানে দেখানো হয়েছিল। বর্তমানেও তাঁর
উত্তরাধিকারীগণের অনেকেই দেশে-বিদেশ ও বিভিন্ন দপ্তর ও সংগঠনসহ শিক্ষা
দীক্ষা, সাংবাদিকতা ও সমাজ সেবায় বিশেষ অবদান রেখে যাচ্ছেন। এ মহতি
সমাজ সেবক ১৯৫০ সালের মার্চ মাসে ইন্তেকাল করেন।